বৃহস্পতিবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

ফেসবুকে প্রেম তারপর. . .

খুব ইচ্ছে করছিল ওকে জানালা দিয়ে দেখি, কিন্তু বেরসিক পর্দাটা যেন ব্যঙ্গের হাসি হেসে হেসে দুলছিল আমাদের মাঝখানে! . আমরা টুকটাক কথা চালাতাম। অনেক দিন ধরে মা-বাবা-খুকু ছাড়া কোনো বাইরের মানুষের সাথে কথা বলি না আমি। মানুষ খুব ভয় পাই। তবুও মিমির সাথে কিভাবে যেন সহজ হয়ে গেলাম! এটা ওটা জিজ্ঞেস করতাম, কিন্তু কখনো আমার নিজের ব্যাপারে কিছু বলতাম না। এটাও বলতাম না, আমি ওকে দেখি জানালা দিয়ে। শুধু সাধারণ কথা চালাতাম। আগের মত জানালায় বসে থাকিনা এখন। টাকা শেষ হয়ে গেলে মালেক চাচাকে দিয়ে রিচার্জ করাই। আর পাগলের মত স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকি- কখন মিমির রিপ্লাই আসবে। . একদিন মিমি বললো, -আপনি আর কবিতা-টবিতা লেখেন না কেন এখন? আগে দেখতাম সুন্দর কবিতা লিখতেন। আমি ভ্যাবাচকা খেয়ে গেলাম। তাই তো! এখন তো আমার মাথায় আর কবিতা আসে না। আমি মানুষের নামই মনে রাখতে পারিনা ঠিকমত। কি বলবো না ভেবে পেয়ে বললাম, -কবিতা লিখা হয় না আর। ও বললো, -কেন হয়না? লিখবেন। দুই-চার লাইনের অসাধারণ কবিতাগুলি! আপনার টাইমলাইনে দেখলাম। চমৎকার লিখতেন তো আপনি। লিখবো? কিভাবে লিখবো? কিছুই তো মাথায় আসেনা। আচ্ছা, আগে কিভাবে লিখতাম? আগের কথা তো মনেও পড়ে না সেভাবে। তবুও, মিমি যখন বলেছে, একটা চেষ্টা দিয়ে দেখতে ক্ষতি কি! . আগের স্ট্যাটাসগুলা চেক করতে লাগলাম আমি। আহারে! কি সুন্দর সব কবিতাগুলি! চোখ জল এসে গেল আমার। খুব ঝাপসা মনে পড়ে দিনগুলা। একটু একটু করে মনে করি... দুইটা অন্ত্যমিল, চারটা লাইন, একটা মেসেজ থাকতো মাঝে মাঝে... দূর! মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। শীতের মধ্যেও ফ্যান ছেড়ে দিয়ে বসে থাকি। . আরেকদিন মিমি বলে, -আমার একটা ফটোর ক্যাপশনের জন্য চারটা লাইন লিখে দেবেন? আমি হাসবো না কাঁদবো! বললাম, -ক্যাপশনে মানুষ বড় বড় কবিদের লাইন দেয়। রবি-সুনীল-জীবনানন্দ... -আমার আপনারটাই লাগবে। বাপরে! একেবারে স্ট্রেটকাট দাবি! ছবিটা দেখলাম। দেখার পরেই কি মনে হল, টুকটুক করে টাইপ করে ফেললাম লাইনগুলি, “এলোকেশী, এলোকেশী, মেঘের দেশে থাকো, এলোকেশী, বর্ষা এলে কোথায় তারে রাখো?” লিখে আমিই অবাক! আমি পারলাম! ঠিক ঠিক দু লাইন লিখে ফেললাম! মিমির ছবির ক্যাপশন ক্রেডিটে আমার নাম চলে গেল। কেউ তেমন একটা গা করলো না, চিনলোও না নামটা। দেড় বছর অনেক সময়। ঋজু ভট্টাচার্যের নাম কেউ মনে রাখেনি। মানুষ বড় ভুলোমনা জীব। . মিমি প্রায়ই জিজ্ঞেস করতো, প্রোফাইল পিকচার কেন চেঞ্জ করিনা। আমি সদুত্তর দিতে পারতাম না। যে ছবিটা এখন আছে, সেটা মাঝে মাঝে দেখি। স্ক্রিনে আঙ্গুল বুলাই। রাজপুত্রের মতো একটা ছেলে। খুব সাবধানে থাকতাম, যাতে মিমি আমার এখনকার অবস্থা না জানতে পারে। ওর বাসা যে আমার বাসার উল্টোদিকে, সেটাও আজ পর্যন্ত জানাইনি ওকে। মাঝে মাঝে দুপুরের সেই দুঃখী বাতাসে পর্দাটা সরে যায়, আর আমি এক চিলতে মিমিকে দেখতে পাই। . আমার কোনো বন্ধুর সাথে আমার যোগাযোগ না থাকলেও, একটা বন্ধু আমাকে নিয়মিত দেখতে আসতো। সামির। গ্যাদাকালের বন্ধু। মাসে একবার বাসায় আসবেই ও। ঘরে ঢুকেই মাকে সালাম দিবে, খুকুর ঝুটি ধরে একটা টান দিবে, আর মায়ের বানানো নুডুলস খেয়ে আমার ঘরে চলে আসবে। আমি আগেই বলেছি, মা-বাবা-খুকু ছাড়া বাইরের কারো সাথে কথা বলি না এখন। সামির ব্যতিক্রম। একমাত্র বন্ধু বয়লতে এখন ওই আছে। ছেলেটা বকবক করতে থাকে। আমি চুপচাপ শুনি। সামির ভার্সিটির গল্প করে, খেলার গল্প করে, নতুন মুভির গল্প করে। মাঝে মাঝে আমাকে বেড়াতে নিয়ে যায়। সামির ছাড়া কারো সাথে বের হতে দেয়না মা আমাকে। ওর সাথে আমি আমাদের বাড়ির সামনে লেকটার পাড়ে ঘুরি। মাঝে মাঝে সন্ধ্যা পর্যন্ত লেকের পাড়ে বসে থাকি। তারপর আমাকে বাসায় দিয়ে সামির চলে যায়। তারপর আমি আবার জানালায় বসি দূরবীন নিয়ে। না হয় মিমির সাথে কথা বলি। জীবনটা আগের চেয়ে খারাপ কাটছে না। . কিন্তু সুখ জিনিসটা হল ভোলাটাইল। উদ্বায়ী। খুব স্বল্পক্ষণ থাকে। আমারও তাই হল। অপ্রত্যাশিত ঘটনাটা ঘটে গেল সেদিন। . সামিরের সাথে লেকের পাড়ে বসে ছিলাম সেদিন বিকালে। বিকাল হলেই অনেক মানুষ বসে এখানে, ঘুরতেও আসে। পাশে মানুষ হাটার রাস্তা। সামিরের পাশে বসে থাকতে থাকতেই আমি আচমকা খেয়াল করলাম, মিমি আসছে! সাথে ওর দুজন বন্ধু। হাঁটতে হাঁটতে আমাদের দিকেই আসছে। ডুবন্ত সূর্যের আলোয় দেখলাম, আসলেই অসাধারণ মেয়েটা। হঠাৎ দেখি সামির বলে উঠলো, -আরে, মিমি নাকি এইটা! আমি অবাক। -তুই মিমিকে চিনিস? -আলবাত! অনেক দিনের চেনা! বলে লাফ দিয়ে উঠলো। মিমির সাথে কথা বলবে। আমার তো গলা শুকিয়ে গেল ভয়ে। ও যদি আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয়? মিমি আমাকে এই অবস্থায় দেখবে? হায় ঈশ্বর! ঠিক ঠিক তাই হলো। সামির আমাকে দেখিয়ে মিমিকে বললো, “ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড, ঋজু। ঋজু, ওকে মনে হয় চিনিস, ও মিমি। থার্ড ইয়ারে পড়ে এখন......” ওদিকে মিমি একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে আমার দিকে। চিনতে কষ্ট হচ্ছে বোধহয়। স্বাভাবিক। ফেসবুকের ছবির ঋজুর সাথে এই ঋজুর অনেক তফাত। আমি অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে আছি। অস্ফুট স্বরে ও জিজ্ঞেস করলো, -আপনিই...ঋজু ভট্টাচার্য? অনেক কষ্টে মাথা নাড়লাম আমি। শুনলাম সামির ওকে বলছে, “ঋজু আসলে গত বছর একটা দুর্ঘটনায় পড়েছিল...” আমি আস্তে করে হাঁটতে হাঁটতে বাসায় চলে এলাম। খুব দুর্বল লাগছে। . কিছুক্ষণ পর মিমির মেসেজ এলো। পড়লাম। “আপনি একজন অসুস্থ, মানসিক রোগী? আমি এতদিন একজন মানসিক রোগীর সাথে প্রতিদিন কথা বলতাম? আর আপনি দেড় বছর আগের সুন্দর চেহারার ছবি ঝুলিয়ে রখেছেন? বাহ! ড্যাম ফ্রড ইউ আর! কবিতাগুলিও নিশ্চয়ই আগের লেখা? চমৎকার করেছেন। আপনি কোনোদিন আর আমাকে মেসেজ দিবেন না। নেভার।“ মেসেজটা পড়ার পর মনে হয় আমি মূর্ছা গিয়েছিলাম, খেয়াল নেই। . হ্যাঁ আমি মানসিক রোগী। অসুস্থ। ঠিক দেড় বছর আগে, বান্দরবানের এক বিপজ্জনক রাস্তায় আমিসহ কয়েকজন যাত্রীর জিপ খাদে পড়ে যায়। মারাত্নক সেই দুর্ঘটনা সারভাইব করলেও আমি মাথায় চোট পাই প্

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন