“তুমি চাকু মারবে কেন? তারচেয়ে বড়
কথা, তোমার সাথে ওটা থাকবেই বা
কেন?” রাগে-দুঃখে-ক্ষোভে টকটকে
লাল হয়ে উঠলো সীমার ফর্সা মুখটা।
সব হারানোর দৃষ্টি ওর চোখে। গলা
বেয়ে উঠে আসা কান্নাটা গিলে ফেললো
কোনরকমে। “ভেবেছিলাম তোমাকে
ভালো করতে পারব। ভালোবাসা দিয়ে
গড়ে তুলতে পারবো নিজের মত করে।
আসলে তুমি তা হবার নও। পশু কোন
দিন মানুষ হয় না।”
.
মহল্লার বখাটে ছেলেপেলেদের লিডার
বলা চলে আরিফ কে। সারাদিন বাইক
নিয়ে টই টই করে ঘুরে বেড়ানো আর
বাজে ছেলেদের সাথে বসে তাস পিটানো
নিত্য দিনের কর্ম। সিগারেটের ধুঁয়া না
হলে তাস খেলাটা ঠিক জমে না। ওটাও
চলে বেশুমার। ইদানিং সিগারেটের সাথে
গাঁজা টানতেও শিখে গেছিল। মাস চারেক
আগে সীমার সাথে পরিচয়। ফেসবুকে।
বলাই বাহুল্য ফেসবুকের আরিফ আর
বাস্তবের আরিফে আকাশ পাতাল
তফাৎ। স্বভাব যাই হোক চেহারা সুরত
মাশাল্লাহ। কিভাবে কিভাবে জানি
প্রেমটা হয়েই গেলো সীমার সাথে।
প্রথমে কিছু টের পায়নি সীমা, সময়ের
সাথে সাথে সব কিছুই জানতে পারে।
ততদিনে সীমার মনে খুব ভালোভাবেই
জায়গা করে নিতে পেরেছে সে। মেনে
নিয়েছিলো। ভেবেছিলো শুধরাতে পারবে
আরিফকে। আরিফও বদলাতে শুরু
করেছিলো। মহিলা কলেজের সামনে থেকে
কমে আসতে লাগলো ওর উপস্থিতি।
মেয়ে দেখলেই বাজে মন্তব্য করার
স্বভাবটা পুরোপুরিই ছেড়ে দিতে
পেরেছে। তাসের আড্ডাতেও আজকাল
দেখা যেত না। তবে বাইকটা ছাড়তে
পারে নি। ওটা ছাড়ার প্রয়োজনও
পরেনি। মাঝে মাঝেই সীমাকে বাইকের
পিছনে বসিয়ে হারিয়ে যেতে চাইতো দূর
অজানায়। সময়টা বড্ড বেশি সুখের
কাটছিলো। বিকেলে প্রায়ই পার্কে
বেড়াতো দুজন। এমনই কোন এক
বিকেলে পার্কের রাস্তায় হাতে হাত
রেখে হাটতে হাটতে সুখস্বপ্নের জাল
বুনছিলো ওরা। “ছোট্ট একটা বাড়ি,
সামনে এক চিলতে লন। সেখানে ছোট
ছোট পায়ে ফুটবল খেলছে দুটি বাচ্চা।
না, দুটি না, চার-পাঁচটি।” এই নিয়েই
তর্ক বেঁধে গেল। সীমা বলছে দুটো
বাচ্চা, একটি ছেলে আর একটি মেয়ে
কিন্তু আরিফের চাই আরো অনেক
বেশি। অন্তত আট দশটি। একটা
ফুটবল টিমই যদি করা না গেল তাহলে
আর কিসের সংসার!
.
দোস্তরে এক্কেরে খাসা মাল। ইচ্ছা
করতাছে এইখানেই বাচ্চা হওনের কামডা
সাইরা ফেলি। ইশশ একবার যদি
পাইতামরে... আড়ষ্ঠ হয়ে গেলো সীমা।
বরফের মত জমে গেছে যেন। পিছন
থেকে ভেসে এসেছে শব্দগুলো। অনেকখন
ধরেই ওদের পিছু পিছু আসছিলো ছেলে
দুটো। আরিফও শুনতে পেয়েছে। পেছন
ফিরে দেখতে পেলো হাত ছোঁয়া দুরত্বেই
রয়েছে ওরা। এর পর আর কিছু মনে নেই
ওর। দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে।
চাকুটা বের করেই সামনের দিকে
চালালো। কোথায়, কার গায়ে, কিভাবে
লেগেছে? কিচ্ছু জানে না ও। কিচ্ছু না।
কিছুটা ধাতস্থ হয়েই নিজেকে
আবিষ্কার করে হাতকড়া পরা
অবস্থায়। পার্কের পাশেই টহল দিচ্ছিল
দুজন পুলিশ।
.
আরিফের সাথে দেখা করতে এসেছে
সীমা। জেলখানায়। বহুকষ্টে এতক্ষন
কান্নাটা আটকে রেখেছিল। কথাগুলো
বলেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। চোখের
পানি মুছে দেবার জন্য গরাদের ফাক
দিয়ে হাত বাড়াল আরিফ। পিছন থেকে
হ্যাচকা টানে আরিফকে সরিয়ে আনলো
গার্ড। ভিজিটিং আওয়ার শেষ। একবার
শুধু চোখ তুলে চাইলো সীমা। না, কান্না
থামেনি এখনো। আরিফের সাধ্য নেই এ
কান্না থামানোর।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন