বৃহস্পতিবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

কিছু ভালবাসার গল্প

দ্বিতীয় জন্ম না। গাছ-টাছ আমি খুব একটা চিনি না। টিনশেড বাড়িগুলোর সামনে একপাল বাচ্চা সারাদিন হইহুল্লোড় করে খেলে বেড়ায়। বেশ লাগে দেখতে। . আপনারা ভাবতে পারেন, আমি কাজকর্ম বাদ দিয়ে সারাদিন জানালা দিয়ে এসব দৃশ্য অবলোকন করি। আসলেও তাই। আমার তেমন কাজকর্ম নেই কোনো। জানালার সামনে একটা চেয়ার আছে, দুলুনি চেয়ার। আমি সারাদিন চেয়ারে বসে দূরবীন দিয়ে জানালার বাইরের দৃশ্য দেখি। দূরবীনটা আমার ছোটমামা পাঠিয়েছিলেন বিদেশ থেকে, একটা হান্টার বাইনোকুলার। কোন বিদেশ? কি জানি, মনে পড়ছেনা। ইদানীং কিছু মনেও রাখতে পারিনা ছাই। সে যাক, আমি করি কি, চেয়ারটাকে জানালামুখো করে বসি, দূরবীনটা চোখে লাগাই, আর মানুষজন দেখি। কত্ত রকম মানুষ! ডানদিকের গাছটা ঘেষে যে বাড়িটা, সেটার দোতলায় এক বুড়ি থাকেন। সারাদিন ছোট্ট নাতিটার পিছে পিছে দৌড়ান। নাতিটা গুটগুট করে দৌড়ায়, বুড়িটা থপথপ করে দৌড়ায়। হিহি! চারতলায় থাকে একটা আস্ত পরিবার- ছেলেটা সন্ধ্যা হলে হাঁটাহাটি করে পড়া মুখস্ত করে, মাঝে মাঝে তার মা এসে চিল্লাচিল্লি করেন। চিল্লাচিল্লির শব্দ তো আর শোনা যায় না, আমি শুধু দূরবীন দিয়ে তাঁর হাত পা নাড়ানো দেখি।! মজা লাগে খুব। . সোজা নাক বরাবর সাদা বাড়িটায় অনেক মজার মজার মানুষ থাকে জানেন। দোতলায় একটা দুরন্ত বাচ্চাছেলে আছে, সারাদ্দিন গ্রিলে ঝুলে টারজানের মত। তিনতলায় থাকেন দুইজন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। খুব নিরীহ, একাকী জীবন কাটান দুজন। বুড়োটাও আমার মত, সারাদিন জানালার পাশে বসে থাকেন। বইপত্র পড়েন। চারতলায় একটা নবদম্পতির বসবাস, আমি সেদিকে বেশী তাকাই না। আর তার উপরের তলায় থাকে...... কে থাকে জানেন? হুম হুম। একজন থাকে। বিশেষ একজন। ওর নাম? দাড়ান বলছি। একটা ইতিহাস আছে এটার পিছনে। বলি তাহলে। . এই সাদা বাড়িটার পাঁচতলায় নতুন ভাড়াটিয়া এসেছে সেদিন। আগের পরিবার চলে যাওয়ার পর দিন সাতেক ফাঁকা ছিল। সেদিন আমি দূরবীন দিয়ে দেখলাম মানুষজন ঝাড়াপোঁছা করছে ঘরটা, তাই বুঝলাম। খুশি হলাম, নতুন নতুন মানুষ আসবে। তো তার পরের দিনের কথা, সন্ধ্যাবেলা। সন্ধ্যাবেলাটায় আমি বসে বসে কফি খাই, আর গ্রিলে মুখ রেখে, চোখে দূরবীন দিয়ে আকাশের তারা দেখি। তারা দেখতে দারুণ লাগে জানেন! আমি তারা চিনিও কয়েকটা। সে যাই হোক, আকাশ থেকে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ দূরবীনের ভিউটা থমকে যায় সাদা বাড়িটার পাঁচতলায়। কি দেখলাম বলেনতো? হিহি ঠিক। আমি সেই প্রথম দেখলাম মেয়েটাকে। . জানালায় হেলান দিয়ে, কোলে ল্যাপটপ রেখে ফেসবুকিং করছিল মেয়েটা। কিভাবে বুঝলাম ফেসবুক চালাচ্ছিল? আমার দূরবীনটা অনেক শক্তিশালী, হান্টার দূরবীন বলে কথা! অনায়াসে কয়েকগুণ জুম করে আমি পরিষ্কার ল্যাপটপের স্ক্রিনটা দেখতে পেলাম। কাজটা খারাপ করেছি? তা বটে। মানুষের উপর নজরদারী বাজে কাজ, আমিও লজ্জা পাই। তবুও করি। আমার আর কোনো কাজ নেই যে! . যেটা বলছিলাম। ওর ল্যাপটপের স্ক্রিনে দেখলাম, ওর আইডির নাম মিমি। পুরো নাম কি কে জানে! খুব মনোযোগ দিয়ে একটা লেখা পড়ছিল। আমার অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম মেয়েটার দিকে। পেছন ফিরে ছিল বলে মুখ দেখা যাচ্ছিল না, একরাশ লালচে চুল... হ্যাঁ লাল লালই লাগলো... ঢেকে রেখেছিল মুখটা অনেকটা। কতক্ষণ দেখছিলাম জানি না। হঠাৎ ল্যাপটপটা কোল থেকে নামিয়ে রাখলো মেয়েটা, দৌড় দিয়ে ভিতরে চলে গেল। কেউ ডেকেছে বোধহয় ভেতর থেকে। একনজর দেখতে পেলাম ওকে, দেখেই আমার হাত দুর্বল লাগা শুরু হল। আহা! আমার এই একলা জীবনে তুমি কে এলে গো হরিণী! . একটা বুদ্ধি আসলো মাথায়। অনেকদিন পর টেবিলের ড্রয়ার থেকে খুঁজে খুঁজে আমার ফোনটা বের করলাম। কতদিন বন্ধ ছিল প্রিয় ফোনটা! চুপিচুপি খুকিকে ডাকলাম দরজা দিয়ে। খুকি দরজা অল্প ফাঁক করে উঁকি দিল। -ডাকিস ক্যানো দাদা? -একটা কাজ করে দিবি খুকি? -বল। -আমার ফোনে কটা টাকা পাঠা না! খুব দরকার। -ফোনে টাকা! কাকে ফোন করবে? বাবার ফোন দিয়ে করো... আমার ছোট বোন অবাক! -না রে। দে না প্লিজ! মাত্র বিশ টাকা হলেই হবে। -আচ্ছা। স্কুলে যাবার সময় মালেক চাচাকে বলে রাখবো। . আমি বহুউউ বহুউউ দিন পর আমার আইডিটায় লগ ইন করলাম। বহুদিন মানে? বছর দেড়েক হবে। ভাগ্যিস আমার ডায়েরিটায় ইমেইল-পাসওয়ার্ড সব লিখে রেখেছিলাম, নয়তো সব ভুলে গেছিলাম! . কতদিন পর ফোনের স্ক্রিনে নীল সাদা সাইটটা দেখলাম! ওইতো আমার ছবিটা। ভার্সিটির বৈশাখী মেলায় তোলা। এইটা আমি? এত সুন্দর ছিলাম? বাহ! ছবিটা কে তুলেছিল? কি জানি। মনে পড়ে না। কোনো বন্ধুই হবে। আজকাল কোনো বন্ধুকেই তেমন মনে পড়ে না। আমি অবাক চোখে স্ক্রল করতে লাগলাম আমার টাইমলাইনে। কি সুন্দর একেকটা গুচ্ছ কবিতা! আমার লেখা এগুলা? মনে হয়। আচ্ছা, আমি এখন কেন ওরকম লিখতে পারিনা? কিছু ভাবতে গেলেই তো গুলিয়ে যায় কেমন জানি! কেমন যেন হয়ে গেলাম! আগের মত কবিতা আসে না, গানও কতিন গাই না! খালি মাথা গরম হয়ে যায় ভাবতে গেলে... . এই যা। যেটার জন্য ফেসবুকে আসা সেটাই করিনি এখনও। মিমিকে খুঁজতে হবে। মিমি প্রিয়ন্তিনী। নামটা ইউনিক, একটু খোঁজাখুঁজির পরেই পেয়ে গেলাম। দিব রিকোয়েস্ট? আমার হাত কাঁপতে লাগলো। যদি এক্সেপ্ট না করে? অপমান করে? দ্বিধাদ্বন্দ্বে হাবুডূবু খেতে খেতে পাঠিয়ে দিলাম। সারাদিন আমি ওর ঘরের জানালাটায় চোখ সাঁটিয়ে বসে থাকতাম। ও মনে হয় সারাদিন ভার্সিটি শেষে বিকালে ফিরতো, আমার মনে হয় আরকি। ওর ঘরের জানালায় এখন পর্দা টানানো। এজন্য ওকে দেখাই যায়না বলতে গেলে। কি যে খারাপ লাগে আমার! মাঝে মাঝে দুপুরের দিকে একটা মন খারাপ করা দমকা হাওয়া আসতো, তখন হুশ করে পর্দাটা উড়ে যেত, আর কয়েক সেকেন্ডের জন্য মিমিকে দেখতে পেতাম আমি। হয় মনোযোগ দিয়ে বই পড়ছে, নয়তো ফোনে মুখ গুজে আছে। ওদের বাসায় তেমন আর কেউ নেই মনে হয়। ওর মা কে দেখেছি একদিন, গোলগাল ভালমানুষ টাইপ মহিলা। আমাকে খারাপ ছেলে মনে হচ্ছে, না? আমি দূরবীন দিয়ে একজন মেয়ের ঘরে তাকিয়ে থাকি? বিশ্বাস করুন, আমি খুব বন্ধুহীন একটা জীবন কাটাই।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন